ভোলার গ্যাস সিএনজি (কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস) করতে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করে সাড়ে চারশ কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন পিএলসি। আর এই উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। নিজের পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দিতে কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনে ভোলার গ্যাস সিএনজি করার চুক্তি করা হয়।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরই ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন ছাত্র-জনতা মিলে ভোলায় অবস্থিত ইন্ট্রাকোর রিফুয়েলিং স্টেশনটি বন্ধ করে দেয়। এখনো স্টেশনটি বন্ধ আছে। অন্যদিকে, এ খাতের ব্যবসায়ীরা চুক্তি বাতিল করে পুনরায় দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উত্তম কুমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। দুদিন ধরে ইন্ট্রাকোর এমডি রিয়াদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকেও পাওয়া যায়নি। এমনকি ইন্ট্রাকোর অন্যান্য কর্মকর্তারাও তার বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি। তবে ভোলার গ্যাস সিএনজিকরণের কাজ বন্ধ আছে বলে নিশ্চিত করেছেন তারা। কথা হয় সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) প্রকৌশলী প্রদীপ রঞ্জন কুণ্ডুর সঙ্গে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে সরবরাহ এখন বন্ধ আছে। যতদূর শুনেছি, দাম বেশি হওয়ায় তাদের হাতে এখন ক্রেতা নেই।
অটোগ্যাসের স্টেশন মালিক সমিতির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. সিরাজুল মাওলা এ প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, ভোলার গ্যাস সিএনজি করার প্রকল্পে সরকার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিকে বিশেষ আইনে কাজ দিয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটি যে পদ্ধতিতে ভোলার গ্যাসকে সিএনজি করেছে, তা জটিল। এর চেয়ে সহজ পদ্ধতি বা টেকনোলজি আছে। কিন্তু ওই কোম্পানি ছাড়া কাউকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। অনেক কোম্পানি সেই সময় আগ্রহ দেখালেও কাউকে কাজ দেওয়া হয়নি।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোলার গ্যাস সিএনজি করে মূল ভূখণ্ডে আনার আগে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ পাইপলাইন বসাতে আগ্রহী ছিলেন না। পাইপলাইন নির্মাণে দেরি হবে অজুহাতে সিএনজি করে সরবরাহের জন্য বিশেষ আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশনার পর পেট্রোবাংলা উদ্যোগ গ্রহণ করে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ওই সময় প্রায় ৮ থেকে ১০টি কোম্পানি ভোলার গ্যাস সিএনজি করে সরবরাহের আগ্রহ দেখালেও প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় ইন্ট্রাকোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে পেট্রোবাংলা। ইন্ট্রাকোর এমডি রিয়াদ আলী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সহযোগী। এর আগেও এই ইন্ট্রাকোকে একাধিক এলপিজি ফিলিং স্টেশন করার অনুমোদন দেন নসরুল হামিদ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩ সালের ২১ মে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে ১০ বছরের জন্য চুক্তি করে ইন্ট্রাকো। পরে একই বছরের ২১ ডিসেম্বর ধামরাইয়ে অবস্থিত গ্রাফিক্স টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানায় সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস সরবরাহের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। ৩ হাজার পিএসআই (প্রতি বর্গ ইঞ্চি) চাপে প্রতি সিলিন্ডারে গ্যাসের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫০০ ঘনমিটার।
বিশেষ আইনে করার এই চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিটি ভোলা থেকে প্রাথমিকভাবে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরবর্তী সময়ে ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট (৭ লাখ ৮ হাজার ৪১৫ ঘনমিটার) গ্যাস দৈনিক সিএনজি আকারে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করবে। চুক্তি অনুযায়ী, ইন্ট্রাকো সরকার থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কিনেছে ১৭ টাকায়। আর বিক্রি করছে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সায়। ঘনমিটারপ্রতি লাভ ৩০ টাকা ৬০ পয়সা। এই হিসাবে দৈনিক লাভের পরিমাণ ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর মাসে ?????????????????????? লাখ ৬৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ভোলার গ্যাস সরবরাহ করে মুনাফার নামে ৪৫৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ইন্ট্রাকো। বন্ধ না হয়ে কার্যক্রম চালু রাখা হলে বছরে মুনাফা হবে ৭৮০ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা খুবই অস্বাভাবিক।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ভোলার গ্যাস আরও কম দামে সরবরাহ করা যেত। ভোলার গ্যাসকে ১ হাজার পিএসআই থেকে বুস্টার কম্প্রেসরের মাধ্যমে ৩ হাজার পিএসআই প্রেশারে কম্প্রেস করে মোবাইল স্টোরেজের মাধ্যমে জল এবং স্থলপথে সহজে নিয়ে আসা যায়। এতে করে একদিকে কম্প্রেসন চার্জ অর্ধেকেরও কম হবে এবং ডিকম্প্রেসন চার্জ একেবারে বাদ যাবে। দেশে শতাধিক মোবাইল স্টোরেজ বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন থেকে গার্মেন্টস ও শিল্পে গ্যাস সরবরাহের কাজে বিদ্যমান আছে। সরকার চাইলে কয়েকশ ইন্ডাস্ট্রিকে অনুমতি দিতে পারে, যারা ফিড গ্যাসের মূল্য (ঘনমিটারে ১৭ টাকা) পরিশোধ করে নিজস্ব খরচে কম্প্রেস ও পরিবহন করে তাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়ে আসবে। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ ঘনমিটার গ্যাস প্রক্রিয়া করার সক্ষমতার দেশীয় ‘বুস্টার কম্প্রেসর’ মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা, যেখানে প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ খরচ হবে মাত্র ৫০ কিলোওয়াট। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কম্প্রেস করতে খরচ হবে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকা।
অন্যদিকে, বর্তমানে যে মোবাইল স্টোরেজগুলো আছে, সেগুলো একেকটি প্রতিবার ৩ হাজার ঘনমিটার গ্যাস বহন করতে পারে। ভোলা থেকে ঢাকা ও আশপাশে যাতায়াত করতে যদি প্রতিবার ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়, তাহলে পরিবহন খরচ হবে প্রতি ঘনমিটারে মাত্র ৭ থেকে ৮ টাকা। কিন্তু নিজের সুবিধাভোগী ইন্ট্রাকো ছাড়া আর কোনো কোম্পানির প্রস্তাব শুনতে আগ্রহী ছিলেন না সাবেক প্রতিমন্ত্রী।
সিএনজি খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুরুতে চরম গ্যাস সংকটের কারণে কয়েকটি শিল্প-কারখানা এ বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও পরবর্তী সময়ে বেশি খরচ হওয়ায় তারা আর আগাননি। এ অবস্থায় চুক্তিটি সংশোধন করে দরপত্রের মাধ্যমে অন্যান্য কোম্পানিকে কাজ করার সুযোগ দিতে হয়।
প্রতিযোগিতামূলক বাজার হলে সরকার ও গ্রাহক উভয়ই লাভবান হয়। কিন্তু সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সেই দিকে যাননি।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব, প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ক্রয়মূল্য ১৭ টাকার পরিবর্তে ২৭ টাকা এবং কম্প্রেসন চার্জ প্রতি ঘনমিটারে ১০ টাকা হারে যোগ করে বিক্রয় মূল্য ৩৭ টাকা ধার্য করা হলে সরকার, ব্যবসায়ী ও গ্রাহকরা লাভবান হবেন। আগ্রহী শিল্প মালিকরা এই গ্যাস পরিবহন ভাড়া পরিশোধ করে তাদের কারখানায় নিয়ে যাবেন। বর্তমানে ভোলার তিনটি গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট।